Ticker

6/recent/ticker-posts

বিহারীলালের কবি মানস ও আধুনিক বাংলা গীতিকবিতা, সাধের আসন কাব্যের রোমান্টিকতা , বিষয়বস্তু, মৌলিকতা

 গীতি কবিতায় বিহারীলাল

সাধের আসন কাব্যের রোমান্টিকতা , বিষয়বস্তু, মৌলিকতা

________________________________________
বিহারীলালের কবি মানস ও আধুনিক বাংলা গীতিকবিতা
কপি
________________________________________
ভোরের পাখি’ নামে খ্যাত বিহারীলাল চক্রবর্তী (১৮৩৫-৯৫) ছিলেন একজন রোমান্টিক কবি। তিনি আধুনিক বাংলা গীতিকবিতার উদগাতা, জনক, পথ প্রদর্শক হিসেবে নিজেকে স্বতন্ত্র আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেলী, কীটস প্রমুখ ইংরেজ কবির সাথে বিহারীলালের পরিচয় থাকলেও পাশ্চাত্য প্রভাব তার উপর খুব একটা পড়েনি। সারদামঙ্গল কাব্য পরিকল্পনার পশ্চাতে বিশেষ করে কবি মনের উপর প্রাচ্য চিন্তাধারারই প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
রোমান্টিক কবি বিহারীলালের ‘বঙ্গসুন্দরী’ তে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেই দেখা যায় কবির বিচিত্র অনুভূতির বাসনা। কখনো মনে হয় সমস্ত গ্রাম, নগর, বন্দর ছেড়ে একটি অজ্ঞাত নির্জন স্থানে বাস করতে পারলেই তার আনন্দ। আবার-
‘কভু ভাবি কোন ঝরণার
উপলে বন্ধুর যার ধার
প্রচণ্ড প্রপাত ধ্বনি
বায়ুবেগে প্রতিধ্বনি
চতুর্দিকে হতেছে বিস্তার’
প্রকৃতির এমনি এক বিচিত্র আবেষ্টনীর মধ্যে বনের পশু পাখির সাথে মিত্রভাবে বসবাসের যে আনন্দ তা কবিকে প্রলুব্ধ করেছে। কখনো বা সমুদ্র উপকূলে বিক্ষুব্ধ তরঙ্গরাজি সৈকত ভূমিতে আছড়ে মরছে, সেখানে বাসের উদগ্রবাসনাও কবিকে আকর্ষণ করছে। শ্যামল মাঠের উপর বয়ে যাওয়া প্রত্যুষের বায়ুর সাথে সাথে মাঠে বেড়ানোর আনন্দ, সন্ধ্যাকালে বাঁশীতে গ্রাম্য গানের সুরে কালো হয়ে আসা দিগ-দিগন্ত ভরে কুটিরে ফিরে আসার যে আনন্দ ঘোর বর্ষার রাতে যখন বর্জ্ররে গর্জনে বিদ্যুতের ঘনঘটায় প্রকৃতির এক ভীষণ মূর্তি প্রকটিত তার ভেতর দিয়ে মাঠের প্রান্তে একটি জীর্ণ কুটিরে রাত্রি যাপন এ সবই যেন কবি হৃদয়কে মুগ্ধ করেছে। ডড়ৎফং ড়িৎঃয যেমন ইংরেজি সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা করেছেন, তেমনি বিহারীলালের কবিতাও বাংলা সাহিত্যের কৃত্রিম ক্লাসিক যুগের অবসান ঘটিয়ে রোমান্টিক নতুন যুগের সূচনা করেছে। রোমান্টিকতার অন্যতম লক্ষণ প্রকৃতির পানে ফিরে তাকানো। বিহারীলালের মধ্যে নিজস্ব দৃষ্টি দিয়ে প্রকৃতির দিকে তাকাবার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। কবি যেখানে খানিকটা প্রাচীন পথেই চলেছেন, সেখানেও একটা নবীন সরসতা সৃষ্টিতে সচেষ্ট হয়েছেন এবং তার মধ্যেও একটা সহৃদয় নিবিড়তার পরিচয় সুস্পষ্ট।
‘প্রণয় করেছি আমি
প্রকৃতি রমনী সনে
যাহার লাবন্যচ্ছটা
মোহিত করেছে মনে।’
সারদামঙ্গল কাব্যে কবি প্রকৃতির যে চপল বালিকা মূর্তি অংকন করেছেন, তা একদিকে যেমন সংস্কারবর্জিত, অন্যদিকে তেমনি একান্ত সজীবঃ
‘সেই সুরধুনী কুলে
ফুলময় ফুলে ফুলে
বেড়াইতে বনমালা পরি ফুলহার।’
এছাড়া উষা বর্ণনায় কবি বলেছেন-
‘ওই কে অমরবালা দাঁড়ায়ে উদয়াচলে
ঘুমন্ত প্রকৃতি পানে চেয়ে আছে কুতুহলে।
চরণ কমলে লেখা আধ আধ রবিরেখা
সর্বাঙ্গে গোলাপ আভা সীমন্তে শুকতারা জ্বলে।
স্তবকটি পাঠ করলেই মনে হয়ে তা যেন চিত্রে, সঙ্গীতে ও ভাবে অর্পূব হয়ে উঠেছে।
বিভিন্ন কবিতায় কবি বিশ্ব প্রকৃতিকে পটভূমিতে রেখে মানুষের যে সুকুমার চিত্র এঁকেছেন তার মধ্য দিয়ে মানুষের জীবন ধারার সাথে বিশ্ব প্রকৃতির নিবিড় সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। ‘বঙ্গসুন্দরী’র ‘অভাগিনী’ কবিতায় লিখেছেন-
উষসীর কোলে কুসুম কলিকা
প্রফুল্ল হইয়ে বাতাসে দোলে
যবে শিশুমতি ছিলেম বালিকা
দুলিতেম বসি মায়ের কোলে।
এতে একদিকে মায়ের কোলের শিশুমতি বালিকাও যেমন অপরূপ হয়ে উঠেছে- তেমনি উষসীর কোলের কুসুম কলিকার সাথে তার যোগও সুকুমার হয়ে উঠেছে। অপর দিকে কবির কাব্যধর্মের পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে।
ভাবুক কবি বিহারীলালের ভাবধারার তুলনায় তার কাব্য রচনা দুর্বল। কারণ তিনি সচেতনভাবে কাব্যের ভাষা এবং কলা কৌশলের অনুশীলন করেননি। আবেগ প্রধান কবি বিহারীলাল ভাবুক ছিলেন কিন্তু তার ভাবুকতা তত্ত্বরূপেই প্রকাশ পেয়েছে, উত্তম কাব্যরূপে প্রকাশ পায়নি। অর্থাৎ বিহারীলালের কবিতায় আবেগের প্রাধান্য থাকলেও আঙ্গিকের তেমন কোন পরিচর্যা ছিল না। কবির অন্তরের ভাবনা এবং বাইরের কাব্যময় দেহে তার প্রকাশের মধ্যে যে গড়মিল রয়েছে সেই সত্যই প্রচ্ছন্নভাবে ফুটে উঠেছে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তিতে-
‘বিহারীবাবু সর্বদাই কবিত্বে মশগুল থাকিতেন, তাঁহার হাড়ে হাড়ে, প্রাণে প্রাণে কবিত্ব ঢালা থাকিত, তাঁহার রচনা তাহাকে যত বড় কবি বলিয়া পরিচয় দেয় তিনি তাহা অপেক্ষাও অনেক বড় কবি ছিলেন।’
ভাবুক কবি বিহারীলাল কাব্যের ভাষা এবং কলাকৌশলকে কখনো আমলে নেননি। তাই তার সুললিত ভাবনাগুলো কাব্যে ভাষায় প্রকাশের ক্ষেত্রে ভাবের গতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে স্থানে স্থানে। কবির বিখ্যাত দুটি কাব্য ‘সারদামঙ্গল’ ও ‘সাধের আসনে’ কবি নিজের সুরকে নিপূণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারনেনি। ফলে তার কোন কাব্যই সমগ্রভাবে একটানা পাঠ করে আস্বাদন করা যায় না। থেমে থেমে বেছে বেছে পড়তে হয়। সে সকল সার্থক কাব্যাংশ পাহাড়ের ফাটলের সোনার রেখার মত ছড়িয়ে রয়েছে কাব্যের মধ্যে। এ কারণে বিহারীলালের কাব্য হতে বিচ্ছিন্ন শ্লোক বা শ্লোক সমষ্টি আহরণ করা যত সহজ, ভাবে, ভাষায় ও আকারে একটি পূর্ণাঙ্গ কবিতা সংগ্রহ করা তত কঠিন। বিহারীলাল তার অন্তরের সুমিষ্ট ভাবনাগুলো সর্বত্র সুন্দর এবং মধুর করে অন্যের হৃদয়ে সংক্রমিত করতে না পারলেও কোথাও কোথাও তার ভাবনার অতি চমৎকার বহিঃপ্রকাশ ও সার্থক বর্ণনার অনন্য নজীর রেখেছেন। প্রেম প্রবাহিনী কাব্যে ‘বিষাদ’ কবিতায় সন্ধ্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে কবি বলেছেন-
‘সন্ধ্যা দেবী হাসিছেন রক্তাম্বর পরি
ভৈরবে বেটিবহু যেন ভৈরবী সুন্দরী।’
এতে তার সত্যিকারের এবং সার্থক কবি প্রতিভার পরিচয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তার কাব্য গ্রন্থগুলোতে ছড়িয়ে থাকা এমনি সোনালী কবিতাগুলো বেছে বেছে একত্রিত করলে তার সংখ্যাও একেবারে কম নয়। তদুপরি বিহারীলাল চক্রবর্তীর কবি প্রতিভার সার্থক ও সর্বোত্তম স্বাক্ষর তার গীতিকবিতায় ফুটে উঠেছে। গীতিকবিতা সম্বন্ধে খানিকটা আলোকপাত করলেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
গীতিকবিতায় কবি হৃদয়ের বিশেষ কোন অনুভূত সঙ্গীত মাধুর্য সহকারে রূপায়িত হয়। কবির ব্যক্তিগত অনুভূতি এর উপজীব্য, সঙ্গীতের ব্যঞ্জনা নিয়ে তার প্রকাশ। যে শ্রেণীর কবিতায় কবির হৃদয়ের অনুভূতি বা একান্ত ব্যক্তিগত কামনা বাসনা ও আনন্দ বেদনা প্রাণের অন্তঃস্থল থেকে আবেগ কম্পিত সুরে অখণ্ড ভাব মূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করে- তাকেই গীতিকবিতা বলে অভিহিত করা হয়। আন্তরিকতাপূর্ণ অনুভূতি, অবয়বের স্বল্পতা, সংগীত মাধুর্য ও গতিস্বাচ্ছন্দ্য এই কয়টি বৈশিষ্ট্য গীতি কবিতার মধ্যে বিদ্যমান।
বাংলা সাহিত্যের মধ্য যুগে বৈষ্ণব পদাবলীতে গীতি কবিতার বৈশিষ্ট্য প্রথমবারের মত ফুঠে উঠেছিল। মধ্যযুগের মৌলিকতাহীন কাব্যের অঙ্গনে ধর্মীয় অনুভূতি রূপায়নের মধ্যেও হৃদয়ের যে পরিচয় বৈষ্ণব কবিগণ ফুটিয়ে তুলেছেন তাতে গীতিকবিতার লক্ষণের অভাব ছিলনা। বৈষ্ণব কবিতায় কবির শ্রদ্ধাবনত হৃদয়ের ভক্তিটুকুই প্রতিফলিত হয়েছে। এর মধ্যে কবির ভক্তিপূর্ণ হৃদয়ের নিবেদন প্রাধান্য পেয়েছে বলে এতে মানব হৃদয়ের পরিচয় তথা কবি হৃদয়ের বিচিত্র অনুভূতি প্রকাশ লাভ করতে পারেনি। বৈষ্ণব কবিদের বাসনা কামনা রাধা কৃষ্ণের রূপকল্পনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে বলে ব্যক্তি হৃদয়ের প্রত্যক্ষ পরিচয় তাতে নেই। বৈষ্ণব কবিতায় গোষ্ঠীমনোভাব প্রাধান্য পেয়েছে, ব্যক্তি মনোভাব সেখানে গৌণ। একারণে আধুনিক গীতি কবিতার সংগে বৈষ্ণব কবিতার বিস্তর পার্থক্য।
কবি হৃদয়ের বিচিত্র ভাব ভাবনা আধুনিক গীতিকবিতায় প্রকাশমান। জগৎ ও জীবনের সান্নিধ্যে লব্ধ কবির অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটে গীতিকবিতায়। তাই আধুনিক গীতিকবিতা কবিমানসের বিচিত্র অনুভূতির যথার্থ প্রকাশক। পাশ্চাত্য সাহিত্যাদর্শের প্রভাবে আধুনিক যুগের বাংলা গীতিকবিতায় মানবিকতা, জীবনবোধ প্রভৃতি প্রবেশ করেছে। হৃদয়ের সূক্ষ্ম একটা বেদনাবোধ তথা সৌন্দর্য আনন্দানুভূতি গীতিকবিতায় রূপ লাভ করে। বৈষ্ণব কবি তার গোষ্ঠীগত ধর্মচেতনা মানব রসকে ধর্ম রসে অভিসিক্ত করেছে। আধুনিক গীতি কবিতায় বিশ্ব চেতনা কবির আত্মচেতনা ও মানবরসে সিক্ত হয়ে উঠেছে। বিষয়ের বৈচিত্র্যহীনতায় বৈষ্ণব কবিতার সীমাবদ্ধতা, কিন্তু আধুনিক গীতি কবিতায় আছে ভাবের বহুমুখী সমাবেশ।
বাংলা সাহিত্যে এই আধুনিক গীতিকবিতার উদগাতা বা প্রবর্তক কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী। গীতি কবির ভাবরস নিমগ্ন, আত্মচেতনায় আন্তর্লীন হৃদয়ের আনন্দ বেদনার প্রথম প্রকাশ বিহারীলালের কবিতায় রূপলাভ করেছে। কবির অন্তরঙ্গ মনের বৈচত্রপূর্ণ ভাবের ব্যঞ্জনাময় প্রকাশ ঘটিয়ে বিহারীলাল আধুনিক অর্থে বিশুদ্ধ গীতি কবি বলে অভিহিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন।
বিহারীলাল তার কাব্য সাধনার মাধ্যমে নতুন গীতিকবিতার যুগের একটি আভাস মাত্র দিয়েছিলেন, তাঁর পক্ষে পরিপূর্ণ সার্থকতা অর্জন করে আমূল পরিবর্তন আনয়ন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী কালে তার ভাবশিষ্য রবীন্দ্রনাথের হাতে গীতি কবিতার চরমোৎকর্ষ সাধিত হয় এবং বাংলা কাব্যে গীতিকবিতা একচ্ছত্র আধিপত্যের স্বীকৃতি অর্জন করে। বাংলা সাহিত্যে তার অবদানের এই বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেছেন, ‘সে প্রত্যূষে অধিক লোক জাগে নাই এবং সাহিত্যকুঞ্জে বিচিত্র কলগীতি ও কূপিত হইয়া উঠে নাই। সেই উষালোকে কেবল একটি ভোরের পাখি সুমিষ্ট সুন্দর সুরে গান ধরিয়াছিল। সে সুর তাহার নিজের।’
ভোরের পাখি যেমন দিবসের আলোকজ্জ্বল আবির্ভাবের পূর্বে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করে, বিহারীলালও তেমনি বঙ্গ সাহিত্যের কাব্যনিকুঞ্জে একই বৈশিষ্ট্য নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তার কবি প্রতিভার খ্যাতি খুব বেশি সম্প্রসারিত হয়নি, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ মুষ্টিমেয় কয়েকজন মাত্র ছিলেন তার কাজের রসঞ্জ। এ সম্পের্ক ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত বলেছেন, ‘উদীয়মান নবীন সূর্যের একটি অস্ফূট আভাস দেওয়াই ভোরের পাখির কাজ। বিহারীলালও ভাস্বর প্রতিভায় দশদিক উদ্ভাসনকারী রবীন্দ্রনাথের আগমনীবার্তা জানাইয়া কাব্যমোদিগনের দৃষ্টি সেই দিকে ফিরাইয়া গিয়াছেন মাত্র।
গীতিকবিতায় যে ব্যক্তিভাবের পরিচয় মিলে তার উপলব্ধি পূর্বেই সম্ভবপর হয়েছিল মাইকেল মধুসূদন দত্তের চতুর্দশপদী কবিতাবলীতে। সনেট গীতিকবিতার পর্যায়ভূক্ত। মধুসূদন তাঁর সনেটে ব্যক্তিহৃদয়ের পরিচয় রূপায়িত করে গীতি কবির বৈশিষ্ট্যই প্রকাশ করেন। কিন্তু সনেটে আঙ্গিকগত প্রকৃতি লক্ষ্য করলে সহজেই উপলব্ধি করা যায় যে, তার দৃঢ় গঠন সংহতির মধ্যে আত্মভাব সঙ্কুচিত এবং হৃদয়ের আবেগ অনুভূতি নিয়ন্ত্রিত। সনেটের রূপের ব্যাপারে সচেতনতার ফলে ভাবের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ঘটে না। মধুসূদন ছিলেন মহাকবি, তার মহাকাব্যের গুরুগম্ভীর নির্ঘোমে সরল কোমল মনটির অনুরনন ক্ষীণ হয়ে এসেছে ‘চতুর্দশপদী কবিতার শব্দ, ছন্দ, উপমা ও সুউচ্চ প্রকাশভঙ্গি সহজ সরল সংগীত মাধুর্যের বুকে পাষাণ চাপা দিয়েছে। বিহারীলাল এই পাষাণ ভার থেকে বাংলা কাব্যকে উদ্ধার করলেন। তার কাব্যে ফুটে উঠল কবি হৃদয়ের অন্তরঙ্গ সুর। এখানেই মধুসূদন ও বিহারীলালের পার্থক্য।
বাংলা সাহিত্যের ‘ভোরের পাখি’ বিহারীলাল গতানুগতিক কাব্য ধারার মধ্যে এমন এক অভিনব সুর শুনালেন যার মাধ্যমে কবি হৃদয়ের বিচিত্র অনুভূতির সংগে পরিচিত হওয়া সম্ভব হল। এ ক্ষেত্রে কবির সার্থকতার কারণ হিসেবে তার মৌলিকতার কথা উল্লেখ করা যায়। তার কাছে কাব্যকলার চেয়ে কবি হৃদয়ের বৈশিষ্ট্য প্রকাশই বড় হয়ে উঠেছে। তাই তার কাব্যে রূপ অপেক্ষা ভাবের প্রাধান্য বিদ্যমান। তিনি বাংলা কাব্যে যে নতুন সুরের সংযোজন করলেন তাতে কবির অন্তরলোকের সহজ ও স্পষ্ট স্পর্শ লাভ করা সম্ভব হল। তার অধিকার ছিল সীমাবদ্ধ, হৃদয়ভাবের অন্তরঙ্গ প্রকাশের পরিসীমায় তার আনাগোনা অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য তিনি ছিলেন আপন অধিকারের মধ্যে আপনি রাজা।
পাশ্চাত্য ‘লিরিক’ বিশেষণটি বিহারীলালের কাব্য সম্বন্ধে অতি সুপ্রযুক্ত। লিরিক কথাটি ইংরেজী খুৎপ শব্দ হতে উৎপন্ন, খুৎপ বীনা জাতীয় যন্ত্র বিশেষ। যে সকল কবিতা আকৃতিতে ও প্রকৃতিতে এমন যে তাদের শুধু বীনা সহযোগে গান করা চলে সেগুলিই ‘লিরিক’ আমাদের গীতিকবিতা। বিহারীলালের সকল কাব্যই বিশুদ্ধ গীতিকবিতা। মনের বীনায় নিভৃত ঝংকারে তার প্রকাশ। তার এই বিশুদ্ধ গীতিকবিতার মধ্যে একটা বিশুদ্ধ ‘রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গিই বিহারীলালের বৈশিষ্ট্য। যেমন বঙ্গসুন্দরী কাব্যে নারী সম্পর্কে রোমান্টিক মনোভাব সম্পন্ন কবি হৃদয়ের পরিচয় পাওয়া যায়ঃ
‘হৃদয় তোমার কুসুম কানন
কত মনোহর কুসুম তায়,
সরি চারিদিকে ফুটেছে কেমন
কেমন পাবন সুবাস পায়’।
‘মধুর তোমায় ললিত আকাব
মধুর তোমার সরল মন,
মধুর তোমার চরিত উদাব
মধুর তোমার প্রণয় ধন’।
বিহারীলাল গীতিকবিতার প্রবর্তক। তবে এর সাফল্যের পাশাপাশি কিছু কিছু সীমাবদ্ধতা ও লক্ষ্যণীয়। ভাবতন্ময়তা, চিত্রধর্মিতা আর তার সংগে সন্দীত ধর্মীতার সংমিশ্রনে যে গীতিকবিতা বাঙালি পাঠকের হৃদয় হরণ করল, তার ইতিহাস কিন্তু সুপ্রাচীন। সেই ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলাতে গিয়ে যে সত্যটি ধরা পড়ে তা হলো এই যে, কোন বিশেষ যুগ পূর্বাপর সম্পর্কহীন বিচ্ছিন্ন কোন কাব্য ধারার জন্মদাতা নয়। প্রকৃতপক্ষে কাব্যের বহু বিচিত্র ধারা একত্রিত হয়ে কাব্য সৃষ্টির উষালগ্ন থেকেই প্রবাহিত হয়ে এসেছে। কিছু সামাজিক কারণে বাকিটুকু সৃজনশীল প্রতিভার বৈশিষ্ট্যস্পর্শে কোন কোন ধারা কোন বিশেষ যুগে প্রাধান্য অর্জন করে। কাব্য সাহিত্যের এই সমন্বয়ধর্মী ঐতিহ্যটি শ্রদ্ধার সংগেই স্মরণীয়। বিহারীলালের স্থান এবং অবদান বাংলা কাব্যধারায় সুনির্দিষ্ট। প্রকৃতপক্ষে তার প্রবর্তিত রীতি এবং ভাবই ছিল সেই শতকের উপযোগী। তাই মধুসূদনের ক্লাসিকধর্মী ধারা হেম নবীন প্রমুখ নিও ক্লাসিকদের পেরিয়ে এসে গীতিকবিতার রোমান্টিক ধারার মধ্যে স্বতস্ফূর্ত হয়ে উঠেছে।
বিহারীলাল বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাববাহক বক্তব্য নিজের প্রয়োজনমত পর্ব সংস্থান আর ছন্দোরীতি সৃজন করেছেন। পূর্বাপর সম্পর্কের বিচার সে ক্ষেত্রে নিতান্তই অবান্তর। স্তবক রচনার দিকে দৃষ্টি দিলে এর প্রমাণ চোখে পড়ে। সে ক্ষেত্রেও এই প্রয়োজন ধর্মিতা কাজ করেছে। একটা বক্তব্য ধরে দেয়ার জন্যে যে কটি পংক্তি প্রয়োজন, রচিত হয়েছে সেই কটি পংক্তি নিয়ে একটি স্তবক। এখানে কোন বিশেষ রীতি অনুবর্তনের প্রশ্ন কবির মনেই উদ্তি হয়নি। খাঁটি গীতিকবিতার ধর্মই এই। বিহারীলাল খাঁটি গীতিকবিতা ধারার প্রবর্তক।
সমকালীন কাব্য রীতির অতিপ্রত্যক্ষ প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে বিহারীলাল প্রবর্তিত গীতিকবিতা ধারায়। আর সে প্রতিবাদের ভাষাও সমকালীন কাব্যে ব্যবহৃত ভাষার বিরুদ্ধে পরোক্ষ কিন্তু বলিষ্ঠ প্রতিবাদ।
মধুসূদনের বা হেম নবীনের মহাকাব্য আখ্যাকাব্য বিহারীলাল নিঃসন্দেহে পাঠ করেছিলেন। তিনি নিজে সংস্কৃত সাহিত্যে পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন, তবু তদ্ভব, তৎসম শব্দ ব্যবহারের প্রবৃত্তি বা প্রয়োজন বোধ করেননি। অন্তরে ভাবোদয় যে ভাষায় হয়েছে, বাইরে ভাব প্রকাশ ঘটেছে সে ভাষায়। এ প্রসঙ্গে স্মরণীয় আচার্য কৃষ্ণকমলের উক্তি, ‘ভাবরঞ্জক কোন শব্দই প্রয়োগ করিতে তিনি কুন্ঠিত হইতেন না।’ আত্মমগ্ন বাঙালি কবির ভাষাও খাটি বাংলা থেকেছে তার অন্তরের প্রসাদগুনেই।’
উনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যে যে নবীন ভূখন্ড জেগে উঠেছিল তার প্রকৃতি ও ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায় যে বিংশ শতাব্দীর বাংলা কাব্য ধারার ভিত্তি সেখানেই রচিত হয়েছে। গীতিকবিতা তার শৈশব অতিক্রম করে প্রদীপ্ত যৌবনের দিকে পা বাড়িয়েছে।
কবি বিহারীলাল আধুনিক রোমান্টিক গীতিকবিতা ধারার আদিকবি। যে গীতিকবিতা অস্ফুট আর অধস্ফুট ছিল, বিহারীলালের উদাত্ত কণ্ঠে তার সহজ সরল স্ফুর্তি নিঃসন্দেহে স্মরণীয় ঘটনা। গায়ক হিসেবে তার কণ্ঠে মাধুর্য ছিল না, কিন্তু ছিল ‘প্রেমের দরাজ জান’ আর ছিল ‘আকাশে ঠেলিয়া প্রাণ’ গান গাইবার শক্তি।
কবির শ্রেষ্ঠত্ব তার আধুনিক মানসিকতা সৃষ্টিতেও। যে সত্যোপলব্ধি সমাজচেতনা আর ঐতিহ্য চেতনার ঐক্য ঘটিয়েছে, তা যে আধুনিক মনোভঙ্গিরই পরিচায়ক সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। গীতিকবিতায় মম্ময়তামুখ্য। কবি বিহারীলালও নিবিড়ভাবে আত্মমগ্ন। এই আত্মমগ্নতার কারণের মধ্যে উনিশ শতকের নবজাগরণমূলক বিভিন্ন মনোভঙ্গীর ভেতরে তার ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবোধ অন্যতম। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বোধের তীব্রতাই বিহারীলালের নিবিড় আত্মমগ্নতার কারণ। এই মম্ময়তা গীতিকবিতার ভাব উৎস হয়ে উঠেছে। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর পটভূমিতে এই মন্ময়তা যদি মন্ময়তাসর্বস্বতায় পর্যবসিত হত, তবে তার মূল্যহানি হত নিঃসন্দেহে। বিহারীলাল তা হতে দেননি, তাই এখানেও তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত।
প্রাক রবীন্দ্র যুগের কাব্যাশ্রিত ঐতিহ্য ধারা যাদের অবদানে পরিপুষ্ট তাদের মধ্যে প্রধান মধুসূদন, হেমচন্দ্র, বিহারীলাল ও নবীন চন্দ্র। এদের সৃষ্টিগত পার্থক্য, এমনকি এঁদের প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য প্রভাবগত পার্থক্য যে পরিমাণ থাকুক না কেন, এঁরা চারজনই প্রথম শ্রেণীর কবি, গধলড়ৎ চড়বঃং- এই চারজন প্রথম শ্রেণীর কবি মূলত দুটি কাব্য ধারার প্রবর্তক। এই দুটি ধারাকে অবলম্বন করেই বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার প্রকাশ। গীতিধর্মী ধারার প্রথম সার্থক প্রবর্তনের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব বিহারীলালের। মহাকাব্যে মধুসূদন এবং মম্ময়তামুখ্য গীতিকাব্যে বিহারীলাল সমান শ্রেষ্টত্বের অধিকারী।
বিহারীলালের মৌলিকতা আত্মমগ্ন গীতিকবিতার ধারা সৃষ্টিতে এবং নতুন কাব্য দর্শনে। শুধু তাই নয় প্রেম ও প্রকৃতি, কবি জীবনে অবারিত প্রেরণার উৎস্য।
উনবিংশ শতাব্দীর আখ্যানমূলক কাব্যধারার সমান্তরাল ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন আত্মমগ্ন গীতিধর্ম কাব্য শাখার সংযোজন করে বিহারীলাল অনন্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন এবং তিনি শুধুমাত্র রোমান্টিক কবিগনের অগ্রণীই নন, বাংলা কাব্যধারার অন্যতম পথম সারির কবি।
উনবিংশ শতাব্দীর নবীন কাব্যধারার পথপ্রদর্শক যে বিহারীলাল তা সর্বজনস্বীকৃত। যে শক্তি সেদিন প্রাচীন গাথাবলী, রামায়ণ মহাভারতের মধ্যে আর কিছু পরিমাণ পাশ্চাত্য কাব্যধারার মধ্যে পথ সন্ধানে ব্যাপৃত ছিল, তিনি তাকে আহ্বান করে আত্মস্থ হতে শেখালেন। বহির্জগত থেকে অন্তর্জগতের দিকে সে শক্তিকে পরিচালিত করলেন। নতুন জগত আবিস্কার করে সেখানে নবীন কবি সমাজের প্রতিষ্ঠা করলেন। উনবিংশ শতাব্দীর গীতিকবিতা রচনার ক্ষেত্রে সেদিন যে বিপুল সংখ্যক নারী পুরুষ আত্মনিয়োগ করেছিলেন তাদের পূর্বসূরি আর পথপ্রদর্শক যে এই বিহারীলাল একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। সর্বোপরি চেতন অচেতন মানব প্রকৃতি সব কিছুর জন্যে তার অকৃত্রিম প্রেমের পরিমাণ সত্যিই ‘দুর্বহ’ ছিল। তাই কবির উপদেশ অবশ্য নিজের উদ্দেশ্যে-
‘দুর্বহ প্রেমের ভার
যদি না বহিতে পার’
ঢেলে দাও আকাশে বাতাসে ধরাতলে ’
(নিশীথসঙ্গীত-৩২)
এ কবিতায় প্রযুক্তিগত সৌষ্ঠব না ধরা পড়লেও, অকৃত্রিম হৃদয়বত্তার স্পর্শ সহজলভ্য। গীতি কবিতার ক্ষেত্রে এই প্রগাঢ় উপলব্ধিটিই মুখ্য। বিহারীলালের কবিতা উপলব্ধির ভাবের নিগূঢ় আলোতে ধ্র“বতারার মত উজ্জ্বল’। বাংলা গীতি কবিতা ধারার এ যেন দিকদর্শন।

গীতি কবিতায় বিহারীলাল, বিহারীলালের কবি মানস ও আধুনিক বাংলা গীতিকবিতা

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement